১ মিনিটে পড়ুন
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মতো ঘটনা—সবকিছু ছাপিয়ে আবারও বড় অঙ্কের সরকারি প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়েছে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২১ কোটি টাকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রশিক্ষণ প্রকল্পের দুটি বড় প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা, দরপত্রের স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানটির অতীত কার্যক্রম যাচাইয়ের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সূত্র ধরে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। সরকার পরিবর্তনের পরও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির কাজ পাওয়ার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট মহলের কেউ কেউ। তবে রাজনৈতিক যোগাযোগ বা পুরস্কার গ্রহণের তথ্য নিজে থেকে অনিয়মের প্রমাণ নয়; প্রকল্প পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব খাটানো হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণে দরপত্রের নথি ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
চার বিভাগে ২১ কোটি টাকার প্রকল্প
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘তথ্য-প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন যুবদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের প্যাকেজ ১ ও ৩-এর কার্যাদেশ পেয়েছে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড। গত ১৯ জুলাই প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে প্রকল্পের লিড এজেন্সি হিসেবেও প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব পাওয়ার তথ্য রয়েছে।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য দেশের ৬৪ জেলার বেকার তরুণ-তরুণীদের ৩০০ ঘণ্টার এআই ও জেনারেটিভ প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেওয়া। প্রশিক্ষণার্থীদের প্রতিদিন ২০০ টাকা করে যাতায়াত ও খাবার ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এত বড় পরিসরের প্রকল্পে প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন, উপস্থিতি, প্রশিক্ষকের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণের মান এবং ভাতা বিতরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অতীতে একই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ ওঠায় নতুন প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ কঠোরভাবে তদারকির দাবি উঠেছে।
ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী ও কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ
মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে অতীতে ভুয়া বা অস্তিত্বহীন প্রশিক্ষণার্থী দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অনিয়ম এবং কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে আপত্তিকর তথ্য উঠে আসার কথাও বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশিক্ষণার্থী তালিকা, প্রশিক্ষণের উপস্থিতি এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় যথাযথ যাচাই না থাকায় সরকারি অর্থের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন, অডিট আপত্তি কিংবা বিচারিক সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, অতীতের অভিযোগগুলো যাচাই না করেই কীভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে আবারও চার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের দায়িত্ব দেওয়া হলো?
রাজনৈতিক যোগাযোগ ও পুরস্কার ঘিরে আলোচনা
মাসুদ আলমের রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ওই সময়ে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্পে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার তথ্য রয়েছে।
২০২৩ সালে জাতীয় যুব কাউন্সিলের সভাপতি নির্বাচিত হন মাসুদ আলম। ওই নির্বাচনে তাঁর প্যানেলের পোস্টার ও ব্যানারে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া গোসাইরহাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় তাঁর নির্বাচনী প্রচারে স্থানীয় আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাকের ছবি ব্যবহারের তথ্যও সামনে আসে।
মাসুদ আলমের পরিচিতি ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর একাধিক পুরস্কার পাওয়ার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালের ‘শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড’, ২০২৩ সালের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড’, ‘জাতীয় যুব পুরস্কার’ এবং ঢাকা বিভাগে শ্রেষ্ঠ আত্মকর্মীর স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব রাজনৈতিক যোগাযোগ, পুরস্কার কিংবা নির্বাচনী প্রচারের তথ্যের সঙ্গে বর্তমান প্রকল্পের কার্যাদেশের কোনো অনিয়মের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নথিভিত্তিক তদন্তের বিষয়।
দেড় কোটি টাকাসহ গাড়ি আটক, আলোচনায় মাসুদ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৭ আগস্ট রাজধানীর উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় ছাত্র-জনতা একটি প্রাইভেট কার আটক করে। গাড়িটির নম্বর ছিল ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-১৫৮১। গাড়ির ভেতরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ভর্তি একটি বস্তা পাওয়া যায় বলে সে সময় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
তখন অভিযোগ ওঠে, টাকাগুলো সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের লোকজনের কাছে নেওয়া হচ্ছিল। গাড়িটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার ছিল বলেও জানা যায়। সে সময় গাড়িতে উপস্থিত মাসুদ আলম নিজেকে প্রমিজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেন। পরে তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তবে মাসুদ আলমের দাবি ছিল, টাকাগুলো তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন ও অফিস পরিচালনার জন্য রাখা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ জেলায় কর্মীদের বেতন বাবদ বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হতো এবং অফিস ভাড়া বাবদ মাসে প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয় ছিল।
গাড়িতে পাওয়া অর্থের প্রকৃত উৎস, মালিকানা এবং ওই ঘটনার পর কোনো মামলা বা তদন্তের চূড়ান্ত ফল কী হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
দুদকের অনুসন্ধান, ব্যাংক হিসাব জব্দ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা
গাড়িতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার ঘটনার পর মাসুদ আলম ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন নিয়ে দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়টি সামনে আসে।
দুদক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যাংক হিসাবসহ মাসুদ আলমের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকার বিদেশ ভ্রমণেও নিষেধাজ্ঞার তথ্য প্রকাশিত হয়।
পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের বিষয়ে পরিবর্তন এলেও মাসুদ আলমের ব্যক্তিগত হিসাব জব্দ থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে কোন কোন হিসাব জব্দ রয়েছে, কী পরিমাণ অর্থের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর এবং সংশ্লিষ্ট আদেশের সর্বশেষ অবস্থা কী—তা দুদক ও ব্যাংকিং নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আগের প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন, নতুন প্রকল্পেও কি একই ঝুঁকি?
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠান শত কোটি টাকার সরকারি কাজ পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও প্রতিষ্ঠানটিকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দেওয়ার বিষয়ে সুপারিশের আলোচনা সামনে আসে। তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে সেই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি বলে সূত্রের দাবি।
এসব তথ্যের আলোকে নতুন প্রকল্পের দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, কারিগরি মূল্যায়ন, আর্থিক প্রস্তাব, যোগ্যতার শর্ত এবং কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ প্রকাশের দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে একই প্রতিষ্ঠানকে চার বিভাগের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও লিড এজেন্সির দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কী যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়েছে, অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কেন নির্বাচিত হয়নি এবং অতীতের অভিযোগ মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন।
অভিযোগ অস্বীকার মাসুদ আলমের, মন্ত্রণালয়ের সচিব বললেন জানেন না
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে এবং ছড়ানো হচ্ছে। উদ্যোক্তা হওয়াটাই আমার ভুল হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকা ছবি ছড়িয়ে আমাকে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে আর কিছু বলার নেই।’
অন্যদিকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব পেয়েছি। এই বিষয়ে আমার আসলে জানা নেই। জানলে হয়তো বলতে পারতাম।’
প্রকল্পের অর্থ ও প্রশিক্ষণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
প্রায় ২১ কোটি টাকার এআই প্রশিক্ষণ প্রকল্প তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না হলে এবং প্রশিক্ষণের নামে কাগুজে কার্যক্রম পরিচালিত হলে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই প্রকল্পের চুক্তিপত্র, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা, দৈনিক উপস্থিতি, প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা, ভাতা বিতরণের হিসাব এবং পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলোর অডিট প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি।
একই সঙ্গে দুদকের অনুসন্ধানের বর্তমান অবস্থা এবং অতীতের অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সরকারি অর্থে পরিচালিত এ প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তার দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের নামে বরাদ্দ করা অর্থ যেন প্রকৃত প্রশিক্ষণার্থীদের কাজে আসে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।







