ফ্রান্সে ব্যাপক সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ১০০০

১ মিনিটে পড়ুন

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বৈষম্য ও শিক্ষা খাতের সংকটের প্রতিবাদে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন লাখো মানুষ।

শনিবার দিনভর অধিকাংশ সমাবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার পর প্যারিস, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে এই বিক্ষোভে অংশ নেন ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল এর প্রায় দ্বিগুণ। রাজধানী প্যারিসে সমবেত হন অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ।

প্যারিসের বাস্তিল থেকে প্লাস দে লা নাসিওঁ পর্যন্ত পদযাত্রার অনুমতি চেয়েছিলেন আয়োজকেরা। তবে কর্তৃপক্ষ সেই পথের অনুমতি না দিয়ে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বিকল্প পথ নির্ধারণ করে দেয়। সরকার বিক্ষোভকে আড়াল করার চেষ্টা করছে বলে এ সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন আন্দোলনকারীরা। পরে পোর্ত দ্য ইতালি থেকে পোর্ত দ্য ভাঁসেন পর্যন্ত পদযাত্রা করেন তারা। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এতে শিক্ষক, নার্স, পরিবেশবাদী ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও যোগ দেন।

দিনভর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। মুখোশধারী প্রায় ৫০০ তরুণের একটি দল পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করে। জবাবে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। একপর্যায়ে সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিদের ছত্রভঙ্গ করতে গ্রেপ্তার অভিযান চালায় পুলিশ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, বিক্ষোভ ঘিরে দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। গত সপ্তাহের সহিংসতার তুলনায় এবার নিরাপত্তা প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছিল।

বিক্ষোভের কারণে প্যারিস কার্যত অবরুদ্ধ শহরের চেহারা নেয়। নিরাপত্তার স্বার্থে অন্তত ২৪টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। হামলার আশঙ্কায় ল্যুভর জাদুঘর, মুসে দর্সে ও প্যারিস অপেরাসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ ছিল। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে আর্ট বাসেল প্যারিস তাদের কার্যক্রম আগেই বাতিল করে। প্লেস ভেন্দোম ও শঁজেলিজে এলাকায় লুটপাটের আশঙ্কায় অনেক বিলাসবহুল দোকানের বাইরে কাঠের পাটাতন লাগিয়ে আটকে দেওয়া হয়।

রাজধানীর বাইরেও বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। মার্সেইয়ে তরুণেরা রাস্তায় ময়লার পাত্রে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। পুলিশের দিকে পাথর ও বোতল ছোড়েন তাঁরা। শহরটিতে দুটি গয়নার দোকানসহ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়। লিয়ঁ, বোর্দো, গ্রেনোবল, ক্লেরমঁ-ফেরঁ, লিল, রেন, নঁত ও তুলুজেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

এর আগে কয়েকটি শহরে বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। নিস ও মোঁপেলিয়েতে কট্টর ডানপন্থী ও বামপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের অভিযোগ, বামপন্থী কর্মী ও অপরাধী চক্রের পাশাপাশি কট্টর ডানপন্থীরাও কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

মাক্রোঁর প্রতিশ্রুতিতেও কমেনি ক্ষোভ

সংকট নিরসনে গত শুক্রবার শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। সেখানে তিনি আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা ‘পারকুরসুপ’ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে শিক্ষার্থীরা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

মূলত গত মাসে প্যারিসের উপকণ্ঠে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত। শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষের দুরবস্থা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা যুক্ত হন।

গত সপ্তাহের বিক্ষোভে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের পর এবার আগাম নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে কর্তৃপক্ষ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের দাবি, প্রস্তুতি বাড়ানোর ফলে এবার সহিংসতার মাত্রা আগের সপ্তাহের তুলনায় কম ছিল। তবে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ এখনো প্রশমিত হয়নি।

এদিকে অর্লেয়াঁ শহরে কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‍্যালির সম্মেলন ঘিরে পাল্টা বিক্ষোভ হয়েছে। দলটির নেত্রী মেরিন ল্য পেনের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করে সেখানে সমাবেশ করেন আন্দোলনকারীরা। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ছিলেন বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁর দলের সমর্থকেরাও।

প্যারিসের পশ্চিমে গত শুক্রবারের একটি বন্দুক হামলাও উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব থেকে হামলা চালানোর সন্দেহে এক বন্দুকধারীকে খুঁজছে কর্তৃপক্ষ। ওই হামলায় একজন নিহত ও ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীসহ চারজন আহত হন।

প্যারিসের উত্তরের শহর সাঁ-দেনির মেয়র ও মেলঁশোঁর দল ফ্রান্স আনবোডের সদস্য বালি বাগায়োকো বলেন, কট্টর ডানপন্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা জানাতে চান, তারা ভয় পান না।

ফ্রান্সের এই অস্থিরতা প্রতিবেশী দেশগুলোতেও প্রভাব ফেলছে। শনিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় কাঁদানে গ্যাস ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে পুলিশ। ইতালির কয়েকটি শহরেও টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো বিক্ষোভ হয়েছে। আলবেনিয়া থেকেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।

জেএএ

শেয়ার :
শেয়ার করুন