পাহাড়ের বুক চিরে রূপালী ধারা: অপরূপ থানকোয়াইন ঝর্ণা

১ মিনিটে পড়ুন

আলীকদম থেকে তৈন খালে নৌভ্রমণ, এরপর প্রায় দুই ঘণ্টার পাহাড়ি পথ। নির্জন প্রকৃতি, স্বচ্ছ জল আর ঝর্ণার শীতলতায় মিলবে ভিন্নরকম ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।

পাহাড়, খাল, ঝর্ণা আর সবুজ গাছ-গাছালির মেলবন্ধনে প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্যের নাম বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার থানকোয়াইন ঝর্ণা। যেমন সৌন্দর্যের বেড়াজালে আবদ্ধ, তেমনি একটি আকর্ষণীয় পর্যটনস্থল। পাহাড়ি সবুজের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলের স্রোতধারা আর নিরিবিলি পরিবেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের সহজেই মুগ্ধ করে।

আলীকদম বাজার থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে থানকোয়াইন ঝিরি থেকে উৎপন্ন এই ঝর্ণার অবস্থান। তুলনামূলক সহজ ট্রেকিং পথ হওয়ায় অভিজ্ঞ ও নতুন—দুই ধরনের ভ্রমণকারীর কাছেই স্থানটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ঝর্ণার শীতল পানিতে শরীর জুড়ানোর পাশাপাশি পাহাড়ি পথের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে।

থানকোয়াইন ঝর্ণায় যাওয়ার যাত্রাপথও কম আকর্ষণীয় নয়। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা টোয়াইন খালে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভ্রমণের পর শুরু হয় ট্রেকিং। খালের পাশ দিয়ে পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটার সময় চারপাশের সবুজ প্রকৃতি, পাহাড়ি ছড়া ও নির্জন পরিবেশ ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে।

ঝর্ণার পাদদেশে পৌঁছালে দেখা মেলে স্বচ্ছ পানির প্রাকৃতিক জলাধারের। আবহাওয়া ও পানির পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে সেখানে গোসল করে ট্রেকিংয়ের ক্লান্তি দূর করার সুযোগও রয়েছে। হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকলে পাহাড়ে তাঁবু টাঙিয়ে ক্যাম্পিং করার অভিজ্ঞতাও নেওয়া যায়।

থানকোয়াইন ঝর্ণায় যেতে প্রথমে আসতে হবে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায়। আলীকদম থেকে সড়কপথে আমতলী (লংঘাট) বাজারে যাওয়া যায়। সেখানকার আমতলী (লংঘাট) থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তৈন খাল পাড়ি দিয়ে দোছড়ি বাজারে যেতে হয়।

দোছড়ি বাজারের সেনা ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও স্থানীয় গাইডের সহায়তা নিয়ে এরপর শুরু করতে হয় ঝর্ণার উদ্দেশে ট্রেকিং। পাহাড়ি পথ ধরে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছানো যায় থানকোয়াইন ঝর্ণায়।

তবে পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াতের নিয়ম, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও অনুমতির বিষয়টি ভ্রমণের আগে স্থানীয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জেনে নেওয়া জরুরি।

ঢাকা থেকে সড়কপথে আলীকদমে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পরিবহনের বাসে আলীকদমে পৌঁছানো যায়। ভ্রমণের আগে বাসের বর্তমান সময়সূচি ও ভাড়া সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।

থানকোয়াইন ঝর্ণা একদিনে ঘুরে ফিরে আসা সম্ভব হলেও ভ্রমণকারীরা চাইলে রাতে আলীকদমে থাকতে পারেন। উপজেলায় বিভিন্ন আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে খাবারের হোটেলেও ভাত, মাছ, মাংস, মুরগিসহ দেশীয় খাবার পাওয়া যায়।

থানকোয়াইন ঝর্ণার পথ পাহাড়ি ও দুর্গম হওয়ায় ভ্রমণের সময় বাড়তি সতর্কতা জরুরি। ভালো গ্রিপের জুতা ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা উচিত। মোবাইল ফোনসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের জন্য পাওয়ার ব্যাংক, টর্চলাইট ও ফার্স্ট এইড কিট সঙ্গে রাখা যেতে পারে।

ঝর্ণার পাথর ও পাহাড়ি পথে পা পিছলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না যাওয়াই নিরাপদ। বিশেষ করে বর্ষাকালে পানির স্রোত বেড়ে গেলে ঝর্ণার কাছে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ভ্রমণের সময় পাহাড়ি প্রকৃতি, ঝিরি ও ঝর্ণার পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। প্লাস্টিক, বোতল বা ময়লা-আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলে পরিবেশ পরিষ্কার রাখা সবার দায়িত্ব।

প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে থানকোয়াইন ঝর্ণা হতে পারে দারুণ এক গন্তব্য। পাহাড়ি পথের রোমাঞ্চ, খালের নৌভ্রমণ আর ঝর্ণার শীতল জলের মিলিত অভিজ্ঞতা ভ্রমণপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিনের স্মৃতি হয়ে থাকার মতো।

শেয়ার :
শেয়ার করুন