১ মিনিটে পড়ুন
রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ঢাকা ট্রাক ডিপোর কয়েক বছরের আয়-ব্যয়, যন্ত্রাংশ ও টায়ার কেনাকাটা, জ্বালানি ব্যবহার এবং পরিচালন ব্যয়ের হিসাব ঘিরে উঠেছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগে উঠে এসেছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ও ব্যয়ের হিসাব, একই ধরনের যন্ত্রাংশের ক্রয়মূল্যে বড় পার্থক্য, জ্বালানি ব্যবহারের তথ্যের অসংগতি এবং টোল-ফেরি ও আনলোডিং খাতে বিপুল ব্যয়ের বিষয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপোর চালক মো. রফিকুল ইসলাম। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডিপোটির চলতি দায়িত্বে থাকা উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালীন সময়ের আর্থিক কার্যক্রম। অভিযোগকারীর দাবি, সংশ্লিষ্ট নথি, ক্রয়প্রক্রিয়া ও ব্যয়ের হিসাব গভীরভাবে পরীক্ষা করা হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। কোনো আর্থিক অসংগতি বা ব্যয়ের পার্থক্য একাই দুর্নীতির প্রমাণ নয়। ফলে অভিযোগের প্রতিটি বিষয় নিরপেক্ষ তদন্ত, নথি যাচাই ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা জরুরি।
চার বছরে আয় ২৮৩ কোটি, ব্যয় ২৪৮ কোটি টাকা
অভিযোগপত্রে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ট্রাক ডিপোর মোট রাজস্ব আয় ২৮৩ কোটি ৮৫ লাখ ২২ হাজার টাকা। একই সময়ে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪৮ কোটি ৯ লাখ টাকা। এ হিসাবে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান দাঁড়ায় ৩৫ কোটি ৭৬ লাখ ২২ হাজার টাকা।
এই অর্থ কীভাবে হিসাবভুক্ত হয়েছে, ব্যয়ের শ্রেণিবিন্যাস যথাযথ ছিল কি না এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষায় কোনো আপত্তি উঠেছিল কি না—তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সময়ের অনুমোদিত বাজেট, আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক হিসাব ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওই সময়ে জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়েছে ১০৭ কোটি ৪৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৯ টাকা, যা মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৩৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বিপুল এই ব্যয়ের বিপরীতে যানবাহনের প্রকৃত চলাচল, ট্রিপের সংখ্যা, নির্ধারিত রুট, প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি ব্যবহারের হার এবং জ্বালানি সরবরাহের নথির মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
মূল প্রশ্ন হলো, এত বড় অঙ্কের আয়-ব্যয় ও জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না এবং নিরীক্ষায় কোনো আপত্তি থাকলে তার নিষ্পত্তি হয়েছে কি না।
একই ক্লাচ প্লেটের দামে এত পার্থক্য কেন?
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যন্ত্রাংশ কেনা ও মেরামত বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১ হাজার ৮১১ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের আগের সময়ে ব্যয় ছিল ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭১১ টাকা এবং পরবর্তী সময়ে ৬ কোটি ১১ লাখ ১২ হাজার ১০০ টাকা।
অভিযোগে ক্লাচ প্লেট কেনার কয়েকটি মূল্য তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চে একটি ক্লাচ প্লেট কেনা হয় ৮ হাজার ৫০০ টাকায়। একই মাসের পরবর্তী সময়ে দাম দেখানো হয়েছে ১৩ হাজার ৩০০ টাকা এবং ২০২৩ সালের জুনে ১৬ হাজার ৩৫০ টাকা।
দাম বাড়ার পেছনে পণ্যের মান, ব্র্যান্ড, মডেল, কর, পরিবহন ব্যয় কিংবা বাজারদরের পরিবর্তন ছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ক্রয়াদেশ, দরপত্র, সরবরাহকারীর বিল ও বাজারদরের তুলনামূলক তথ্য ছাড়া মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
অভিযোগকারীর দাবি, যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় ভুয়া ভাউচার ও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের বিষয়টিও তদন্ত করা দরকার। এ ক্ষেত্রে স্টক রেজিস্টার, পণ্য গ্রহণের নথি, মেরামতের ওয়ার্কশপ রেকর্ড, বিল-ভাউচার এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
টায়ার কিনতে ১০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টায়ার কেনায় ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ৪২ লাখ ৫১ হাজার ৯৮৮ টাকা।
অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চে ১০.০০-২০ মডেলের এমআরএফ টায়ারের দাম ছিল ২৭ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের জুনে একই ধরনের টায়ারের দাম উল্লেখ করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৮ হাজার ১৫০ টাকা।
প্রশ্ন উঠেছে, বিভিন্ন সময়ে কেনা টায়ারের মূল্য নির্ধারণে কী ধরনের বাজার যাচাই ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল। একই ব্র্যান্ড ও মডেলের পণ্যের দাম তুলনা, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, অনুমোদিত দর, সরবরাহের পরিমাণ এবং পণ্যের মান যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা সম্ভব।
দুদক ও বিআরটিসির নিরীক্ষা বিভাগ চাইলে সংশ্লিষ্ট ক্রয় নথি পরীক্ষা করে দেখতে পারে, ক্রয়মূল্য বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না এবং সরবরাহ করা পণ্য নির্ধারিত মান অনুযায়ী গ্রহণ করা হয়েছিল কি না।
জ্বালানি ব্যবহারে লগবুকের হিসাব মিলবে তো?
অভিযোগে বাসের রক্ষণাবেক্ষণ লগবুক ও ট্রাফিক বিভাগের যাত্রাসংক্রান্ত লগবুকে উল্লেখ করা কিলোমিটারের মধ্যে পার্থক্যের দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর বক্তব্য, জ্বালানি বরাদ্দ, যানবাহনের প্রকৃত চলাচল এবং ব্যয়ের হিসাব সমন্বিতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ে প্রতিটি গাড়ির ট্রিপ শিট, ওডোমিটার রিডিং, জ্বালানি গ্রহণের রসিদ, ডিপো থেকে সরবরাহের রেজিস্টার এবং নির্ধারিত জ্বালানি ব্যবহারের মানদণ্ড মিলিয়ে দেখা দরকার। কোনো পার্থক্য পাওয়া গেলে তার কারণ ও দায় নির্ধারণ করতে হবে।
অভিযোগে টোল ও ফেরি খাতে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা এবং আনলোডিং খাতে একই পরিমাণ ব্যয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব খরচের কিছু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সমর্থনকারী নথি রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলন ও পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, সেটিও যাচাইয়ের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তবে এসব খাতে উল্লেখ করা মাসিক ব্যয়ের অঙ্ক ও সময়কাল মূল হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। ক্যাশবুক, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, টোল রসিদ, ফেরির টিকিট, পরিবহন চালান, আনলোডিং রেজিস্টার এবং অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি ছাড়া অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা যাবে না।
পরবর্তী সময়ে নিট আয়ের হিসাবেও প্রশ্ন
অভিযোগে ঢাকা ট্রাক ডিপোর পরবর্তী দুই ইউনিট প্রধানের দায়িত্বকালীন নিট আয়ের হিসাব তুলে ধরে তুলনামূলক বিশ্লেষণের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে নিট আয় ছিল ৮ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫২ টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আট মাসে নিট আয় দেখানো হয়েছে ৭ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
এই হিসাব সঠিক হলে দ্বিতীয় সময়কালে মাসিক গড় নিট আয় তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে ভিন্ন সময়ের আয়-ব্যয়ের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা, ট্রিপ, রাজস্ব আদায়, জ্বালানি মূল্য, বেতন, মেরামত এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের পরিবর্তন বিবেচনায় নিতে হবে। একই হিসাবপদ্ধতি প্রয়োগ করে নিরীক্ষা ছাড়া শুধু নিট আয়ের পার্থক্য দিয়ে আগের দায়িত্বকালে অনিয়ম প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
দুদকের তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন
অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের আয়-ব্যয়ের খতিয়ান, অনুমোদিত বাজেট, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, ক্রয় ও দরপত্রের নথি, সরবরাহকারীর বিল, ব্যাংক লেনদেন, নগদ উত্তোলনের হিসাব, জ্বালানি লগবুক, টোল-ফেরির রসিদ এবং আনলোডিংয়ের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি কোন কর্মকর্তা ক্রয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন, কে দর অনুমোদন করেছেন, কে পণ্য গ্রহণ করেছেন এবং কে বিল পরিশোধের অনুমোদন দিয়েছেন—তা চিহ্নিত করা জরুরি। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তার আর্থিক প্রভাব, দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা নির্ধারণ করতে হবে।
অভিযোগপত্রে রফিকুল ইসলাম প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ এবং প্রয়োজনে সাক্ষ্য দেওয়ার আগ্রহ জানিয়েছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বিআরটিসির চেয়ারম্যান মো. আব্দুল লতিফ মোল্লা অভিযোগের বিষয়ে বলেছেন, যেকোনো অভিযোগ গুরুত্বসহকারে দেখা হয় এবং তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে দুর্নীতি সহ্য করা হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, মো. আশরাফুল আলমের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনের জন্য সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
তদন্তেই বেরিয়ে আসুক প্রকৃত চিত্র
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ও সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি জরুরি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগের কোনো অংশের পক্ষে প্রমাণ না মিললে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপোর আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন নিরীক্ষা, ক্রয়প্রক্রিয়ার পর্যালোচনা এবং অভিযোগের প্রতিটি বিষয়ের নথিভিত্তিক তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।






