যুদ্ধে দুই পক্ষেই অস্ত্রের জোগান: পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনীতি ও অস্ত্রবাণিজ্যের সমীকরণ

১ মিনিটে পড়ুন

মঈনউদ্দীন মুনাওয়ার


বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা, দর-কষাকষি এবং নানা জল্পনা-কল্পনার যতটা প্রকাশ্যে দেখা যায়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ঘটে পর্দার আড়ালে। এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং বিশ্বরাজনীতির দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। ক্ষমতার সমীকরণ, কূটনৈতিক চালচিত্র ও রাজনৈতিক কৌশলের অন্তরালে কী ঘটছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হতে হতে পেরিয়ে যায় বছরের পর বছর, কখনো বা একটি পুরো যুগ। তত দিনে রাজনীতিবিদদের অনেক হিসাব-নিকাশ ও গোপন সমীকরণ ইতিহাসের পাতায় উন্মোচিত হয়, আর সাধারণ মানুষ তখন বুঝতে পারে—প্রকাশ্যে যা দেখা গেছে, বাস্তবতা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। মূলত সাধারণ জনগণ রাজনীতির দাবা খেলায়  সবসময় নিরব, মাঝেমধ্যে সরব দর্শক বৈ কিছু নয়। চাল কি ছিল,  খেলা শেষ হওয়ার পরেই তারা বুঝতে পারে।পর্দার অন্তরালের রাজনীতি ইন্টারনেটের সাথে তুলনা করলে সহজে বোধগম্য হবে। সাধারণ মানুষ যতটুকু তথ্য ব্যবহার করে তা ডার্ক ওয়েবের তথ্যের  তুলনায় খুবই নস্যি /নগণ্য।  ডার্ক ওয়েবে  থাকা তথ্যের পরিমাণ দৃশ্যমান বা প্রকাশ্য ইন্টারনেটের তুলনায় বহুগুণ বেশি। যা মোট ইন্টারনেটের প্রায় ৯৪% থেকে ৯৯% অংশ জুড়ে রয়েছে।মোটকথা  আমরা প্রতিদিন গুগল বা অন্য সার্চ ইঞ্জিনে যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি, তা হলো বিশাল বরফখণ্ডের   ওপরের দৃশ্যমান চূড়া।আমাদের ব্যবহৃত ইন্টারনেট কোনভাবেই প্রায় ১% থেকে ৬% বেশি না । আর পানির নিচে লুকিয়ে থাকা বাকি বিশাল অংশটিই হলো ডিপ ওয়েব  এবং ডার্ক ওয়েব।

পর্দার অন্তরালের রাজনীতি ঠিক ডার্ক ওয়েবের মতো। যা সময় অদৃশ্যই থাকে।আর যেভাবেই বলা হোক না কেন– আমেরিকা পর্দার অন্তরালে রাজনীতি,কূটনীতি অর্থনীতি অস্ত্র বাণিজ্য ও সামরিক কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশ্বসেরা। উল্লিখিত ক্ষেত্রসমূহে বিশ্বের অন্য কোন দেশ বা জাতি তার ধারে কাছে নেই। 
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সামরিক বাজেট ও অভ্যন্তরীণ অস্ত্র উৎপাদন খাত অত্যন্ত বিশাল। দেশটির মোট সামরিক ব্যয় বা প্রতিরক্ষা বাজেট তাদের জিডিপির প্রায় ৩.১% থেকে ৩.৪%। ২০২৬ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৯৭৫.৬ বিলিয়ন ডলার। আবার অস্ত্র বাণিজ্যেও আমেরিকা শীর্ষস্থানে রয়েছে। বিশ্বের মোট অস্ত্র রপ্তানির প্রায় ৪২% থেকে ৪৩% একা আমেরিকাই নিয়ন্ত্রণ করে। ফলশ্রুতিতে, আমেরিকা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সরাসরি কৌশলগত ভূরাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সামরিক  স্বার্থে, আবার কখনো নীতিগত জটিলতা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধের উভয় পক্ষকেই অস্ত্র বা সামরিক সহায়তা সরবরাহ করেছে।তবে সাহায্য যেভাবেই করুক না কেন আমেরিকার তার অস্ত্র বানিজ্য থেকে কোন ভাবেই পিছিয়ে থাকেনি।
১৯৭৪ সালে সাইপ্রাসকে কেন্দ্র করে ন্যাটোর দুই সদস্য রাষ্ট্র তুরস্ক এবং গ্রিস যুদ্ধে জড়ায়। উভয় পক্ষই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা মার্কিন অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।এই বাস্তবতাই কংগ্রেসকে ১৯৭৮ সালের ‘আর্মস এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ (AECA) পাস করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।আরও সাম্প্রতিককালে, ২০১৯ সালে, তুরস্কের মার্কিন-সরবরাহকৃত বিমান বাহিনী তুরস্কের ভেতরেই মার্কিন-প্রশিক্ষিত এবং সশস্ত্র কুর্দি বিরোধী দলগুলোর ওপর বোমাবর্ষণ করেছিল। ১৯৮০-১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধে  আমেরিকা উভয় পক্ষকে অস্ত্র দেওয়ার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ।মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের প্রভাব ঠেকাতে আমেরিকা ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে   সরাসরি গোয়েন্দা তথ্য, অর্থনৈতিক সাহায্য এবং পরোক্ষভাবে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। অপরপক্ষে, ইরানের ক্ষেত্রে আমেরিকার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কঠোর নীতি অবলম্বন করে অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা।  কিন্তু এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, জনসমক্ষে ইরানের বিরোধিতা করলেও, যুক্তরাষ্ট্র গোপনে লেবাননে জিম্মি হওয়া মার্কিন নাগরিকদের মুক্ত করতে এবং নিকারাগুয়ার ‘কন্ট্রা’ বিদ্রোহীদের অর্থায়নের জন্য ইরানের কাছে গোপনে অস্ত্র বিক্রি করে। এটি ইতিহাসে বিতর্কিত ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি  নামে পরিচিত। 

১৯৪৮ সালের ১৪ই মে ব্রিটিশ মেন্ডেটের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে  তেল আবিবে ডেভিড বেন গুরিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ১৫ ই মে মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক এবং লেবানন — এই পাঁচটি আরব রাষ্ট্র  মিলে ইসরাইল আক্রমণ চালায়। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ও সামরিক সহায়তাদাতা হওয়ার কারণে আরবরা এই যুদ্ধে হেরে যায়। অন্যদিকে, সোভিয়েত প্রভাব রুখতে এবং নিজেদের মিত্রতা বজায় রাখতে যুদ্ধের আগের বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র জর্ডান, লেবানন, সৌদি আরব ও ইরাকের মতো আরব দেশগুলোর কাছেও বিপুল পরিমাণ ট্যাংক, যুদ্ধবিমান এবং রকেট বিক্রি করেছিল। ফলে যুদ্ধে উভয় পক্ষই মার্কিন অস্ত্র নিয়ে পরস্পরের মুখোমুখি হয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের আগে এবং যুদ্ধ চলাকালীন মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য বজায় রাখার মার্কিন নীতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। লেবাননের দীর্ঘমেয়াদি ও সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। লেবাননে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস মার্কিন উন্নত ফাইটার জেট, মিসাইল এবং বোমার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে, লেবাননের রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে শক্তিশালী করতে এবং হিজবুল্লাহর প্রভাব-প্রতিপত্তি  কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ২০০৬ সাল থেকে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে  বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র দিয়েছে। 
সিরিয়া ও ইরাকের গৃহযুদ্ধে মার্কিন অস্ত্র হস্তান্তরের নীতি হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র ইরাকি সেনাবাহিনী এবং সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ বিরোধী চরমপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে শত শত কোটি ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করে। সবচাইতে উল্লেকজনক বিষয় হলো, আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত স্বাধীনতাকামী দলগুলোকে দেওয়া কিছু মার্কিন অস্ত্র শেষ পর্যন্ত আল-কায়েদায় ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গীদের হাতে চলে গিয়েছিল। কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ (CAR)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাকি সেনাবাহিনীর পরাজয় এবং সিরীয় বিদ্রোহীদের অভ্যন্তরীণ দলবদলের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক গাড়ি সরাসরি আইএসআইএস  এবং অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়, যা তারা মার্কিন মিত্রদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে। ইয়েমেনের যুদ্ধেও মার্কিন অস্ত্র শত্রুপক্ষের হাতে পৌঁছে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে  বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সামরিক যান সরবরাহ করছে হুথি বিদ্রোহীদের দমনের জন্য। সিএনএন  ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক তদন্তে দেখা গেছে, সৌদি জোটের অসতর্কতা এবং বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর হাতবদল হয়ে মার্কিন তৈরি সাঁজোয়া যান  এবং অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল সরাসরি হুথি বিদ্রোহীদের হাতে চলে গেছে, যা তারা সৌদি জোটের ওপর হামলায় ব্যবহার করেছে। ২০১৫ সালে ইয়ামেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওবামা প্রশাসন সর্বপ্রথম  হুতিদের  সাথে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়। ২০২৪ সালে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও হুতিদের সাথে মার্কিন কর্মকর্তাদের পরোক্ষ প্রত্যক্ষ আলোচনা হয়। ২০২৫ সালের যুদ্ধ বিরতি নিয়ে হুতিদের সাথে মার্কিন কর্মকর্তাদের আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে গতিদের গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে হুতিরা মার্কিন ও ইজরায়েলি জাহাজে হামলা না করার এবং ২০২৫ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বর্তমানে হুতিরাই সৌদিতে বেশুমার ভাবে আক্রমণ করছে। সৌদি আরবের  ব্যবসা-বাণিজ্য এবং  মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত অস্ত্রের প্রধান একক ক্রেতা দেশ সৌদি আরব। আমেরিকার মোট অস্ত্র রপ্তানির প্রায় ১২% সৌদি আরব ক্রয় করে। আবার সৌদির তেল উৎপাদন বিপননের ক্ষেত্রে আমেরিকার কোম্পানিগুলো জড়িত।  হুতি ও সৌদির ক্ষেত্রে আমেরিকা ভূমিকা হলো – “সর্প হইয়া দংশন কর, ওঝা হইয়া ঝাড়ো”। আমেরিকা একদিকে হুতিদের সাথে গোপন আঁতাত অন্যদিকে সৌদির কাছে সর্বাধিক অস্ত্র বিক্রি ও খনিজ সম্পদ নিয়ে অবাধ ব্যবসা।  ইউক্রেনের ক্ষেত্রে আমেরিকার নীতি সৌদির মতোই। ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের মধ্যে একটি যৌথ খনিজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এই চুক্তির আওতায় ইউক্রেনের লিথিয়াম ও গ্রাফাইটের মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদ উত্তোলনে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে আমেরিকা যৌথ বিনিয়োগ করবে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যূদ্ধ করার জন্য আমেরিকা ন্যাটোর মিত্রদের মাধ্যমে ইউক্রেনের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করছে। আমেরিকা প্রকাশ্যে রাশিয়াকে  তিরস্কার এবং অর্থনৈতিক অবরোধ দিলেও বর্তমানে এই রাশিয়াকে তেল বিক্রি করা অনুমতি দিয়েছে। এই ঘটনার পরে পর্দার অন্তরালে গোপন আঁতাত কিছুটা হলেও প্রকাশ্যে এসেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক যুদ্ধের উভয় পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহ করার ভূমিকা—চাই সেই অস্ত্র এক পক্ষ পাক বা উভয় পক্ষই পাক—এটি একটি অতি সাধারণ ব্যবসায়িক নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কুইন্সি ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণাপত্রে উল্লেখ আছে যে, “ওই সময় পর্যন্ত বিশ্বের সক্রিয় সংঘাতগুলোর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো এক পক্ষকে বা উভয় পক্ষকেই অস্ত্র সরবরাহ করেছিল।” আমেরিকান নীতি-নির্ধারকরা বিশ্বাস করেন বিশ্বজুড়ে   অস্ত্র সরবরাহ  “স্থিতিশীলতা” আনয়নে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে কাজ করে।ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজ  এর উল্টো কথাই ইঙ্গিত করে।অবশেষে এটি স্বীকার করার সময় এসেছে যে, যুদ্ধে অস্ত্রের ব্যবসা শান্তির কোনো নিশ্চয়তা দেয় না, বরং এটি আরও বেশি যুদ্ধ ডেকে আনে, যার ফলে বয়ে আনে চরম মানবিক বিপর্যয় ও পরিণতি। আর এই পরিণতি আমাদের চরম অনিশ্চয়তা মাঝে ঠেলে দিচ্ছে।যার ভবিষ্যৎ শুধুই অন্ধকার।

শেয়ার :
শেয়ার করুন